• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

হিট প্রকল্পে দুর্নীতি: তদন্ত ও সংস্কারের দাবি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের

হিট প্রকল্পে দুর্নীতি: তদন্ত ও সংস্কারের দাবি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ৪ হাজার কোটি টাকার হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছেন দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক।

সোমবার (১১ আগস্ট) ইউজিসি কার্যালয়ে সাক্ষাৎকালে তারা এক ডজন লিখিত অভিযোগ ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজের কাছে জমা দেন। এ সময় ইউজিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান উপস্থিত ছিলেন।

অভিযোগকারীদের মধ্যে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ।

প্রধান দাবি:
১. প্রকল্পের প্রথম ধাপের কার্যক্রম স্থগিত রাখা।
২. একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে রিভিউ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম তদন্ত করা।
৩. নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন রিভিউয়ার দিয়ে ব্লাইন্ড রিভিউ প্রক্রিয়া চালু করা।
৪. দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের অপসারণ ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।
৫. প্রস্তাবনার জন্য উপযুক্ত রিসার্চ মেথডোলজি ফরম্যাট তৈরি করা।

মূল অভিযোগ:


১. রিভিউ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব
শিক্ষকদের দাবি, হিট প্রকল্পের রিভিউ প্রক্রিয়া ছিল অস্বচ্ছ, পক্ষপাতদুষ্ট ও অযোগ্য ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত। অনেক রিভিউয়ারের পিএইচডি ডিগ্রি নেই বা গবেষণার অভিজ্ঞতা নেই। একই বিভাগের শিক্ষকরা নিজ বিভাগের সহকর্মীদের প্রস্তাবনা রিভিউ করেছেন—যা স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে।

২. ব্লাইন্ড রিভিউ দাবির অসত্যতা
প্রকল্প মূল্যায়নকে ব্লাইন্ড রিভিউ বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে আবেদনকারীদের পরিচয় স্পষ্ট ছিল এবং রিভিউয়াররা তা জানতেন। ফলে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হয়নি।

৩. প্রেজেন্টেশন মূল্যায়নে অনিয়ম
উইন্ডো-১-এর মতো যেসব উইন্ডোতে প্রেজেন্টেশন বাধ্যতামূলক ছিল না, সেখানেও প্রেজেন্টেশন নিয়ে প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। প্রেজেন্টেশন বোর্ডে অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন না।

৪. বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালভিত্তিক বৈষম্য
একই বিভাগের একাধিক প্রকল্প প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হলেও কেবল রাজনৈতিকভাবে অনুগত প্রকল্পগুলোকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনেক নামী গবেষক এবং বিভাগকে উপেক্ষা করা হয়েছে, অথচ অপ্রসিদ্ধ বিভাগ বা স্বল্পপ্রকাশনা সম্পন্ন গবেষকরা প্রকল্প পেয়েছেন।

৫. গবেষণা মানের বিচারে পক্ষপাত
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রসায়ন, বায়োটেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের উচ্চ মানসম্পন্ন প্রকল্পগুলো উপেক্ষিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষকরা বাদ পড়েছেন, কিন্তু নিম্নপ্রোফাইলের গবেষকরা রাজনৈতিক কারণে প্রকল্প পেয়েছেন।

৬. রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও প্রভাব
শিক্ষকদের অভিযোগ, হিট প্রকল্পের পরিচালক ও রিভিউয়ার নিয়োগে রাজনৈতিক পক্ষপাত ছিল স্পষ্ট। আওয়ামীপন্থী শিক্ষক নেতারা রিভিউয়ার এবং প্রকল্পপ্রাপ্ত হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছেন। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতাদের প্রকল্প প্রাপ্তিকে “রাজনৈতিক পুরস্কার” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

৭. প্রজেক্ট সাবমিশনের সময় গোপনে বাড়ানো
প্রকল্প জমাদানের নির্ধারিত সময় মধ্যরাতে গোপনে বাড়ানো হয়, যার ফলে নির্দিষ্ট সময় মেনে জমা দেওয়া আবেদনকারীরা প্রতিযোগিতায় বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।

৮. নৈতিক সংকট ও নকল প্রকল্প
পূর্বে চলমান প্রকল্প সামান্য পরিবর্তন করে আবার হিট প্রকল্পে জমা দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো অনুমোদনও পেয়েছে—যা গবেষণার নৈতিকতার পরিপন্থী।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আশঙ্কা
“যদি এই অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের সংস্কৃতি বন্ধ না করা হয়, তাহলে প্রকৃত গবেষক ও শিক্ষকরা নিরুৎসাহিত হবেন, গবেষণার মান ও গতি ব্যাহত হবে এবং দেশের কষ্টার্জিত বৈদেশিক ঋণের অপচয় হবে।”

ইউজিসির প্রতিক্রিয়া
ইউজিসি কর্তৃপক্ষ জানান, হিট প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত গবেষণা প্রকল্পগুলো প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যক্তিগত নয়। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ আনতে হবে এবং কমিশন যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করে ব্যবস্থা নেবে বলে আশ্বস্ত করেন।

শিক্ষকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. সালেকুল ইসলাম, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম ও প্রফেসর ড. মো. সাইফুল ইসলাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোঃ আব্দুল কাদের এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোঃ মিযানুর রাহমান।

১২ আগস্ট ২০২৫, ০৫:৫৭পিএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।