টানা ৬ মাস ১০ দিন কেন্দ্রীয় কারাগারে—আমার সেই দুঃখের স্মৃতি
২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ৮ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতারের আগাম খবর ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। সারাদেশে শুরু হয়েছে চিরুনি অভিযান। অসংখ্য নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। আমরা তখন আন্দোলনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।
সেই দিন বিকেলে বাজার করে বাসায় ফিরলাম। ফ্রেশ হয়ে আমার মেজো মেয়েকে কোলে নিলাম—তার বয়স তখন মাত্র ৫ মাস। হাসিমুখে খেলা করছিলাম ওর সাথে। হঠাৎ করেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ১০-১২ জনের একটি দল বাসায় ঢুকে মুহূর্তের মধ্যে সব এলোমেলো করে দিল। আমার কোল থেকে বাচ্চাটিকে বিছানায় ফেলে দিল, আর সাথে সাথে আমাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ফেলল।
বাবা হিসেবে তখন সবচেয়ে অসহায় মুহূর্ত—মেয়ের কান্না চেপে নিরবে সহ্য করতে হল। অসুস্থ মায়ের কান্না শুরু হলো, বড় মেয়ের বয়স তখন ৪ বছর—সে চিৎকার করছে। স্ত্রী ভয়ে দিশেহারা। আমি যখন বাসায় ঢুকেছিলাম, আশেপাশের সব দোকানপাট খোলা ছিল; কিন্তু আমাকে নিয়ে যাওয়ার সময় সব দোকান বন্ধ, চারদিকে অন্ধকার। ছয়টি মোটরসাইকেল ও দুইটি খাবার ভ্যান প্রস্তুত ছিল।
সারারাত আমাকে গাড়িতে ঘুরানো হলো। বলা হলো—আমি নাকি বাসায় আন্দোলনের জন্য ককটেল বানাচ্ছি, আমাকে ক্রসফায়ার দেওয়া হবে। সারারাত নেতাদের নাম জানতে চাওয়া, কোথায় কে আছে, জিজ্ঞাসাবাদ আর লাঠিপেটা চলল। আল্লাহর রহমতে ভোর ৪টার দিকে থানায় নেয়া হল।
দুইদিন থানায় আটক রাখার পর কোর্টে তোলা হলো। সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হলে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। সেই রিমান্ডে টাকার জন্য এমন নির্মম নির্যাতন করা হলো যে পিঠের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়।
রিমান্ড শেষে আমাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। তখন তৎকালীন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু ভাই এসে খোঁজ নিলেন, খাবারের ব্যবস্থা করলেন, পরদিন সেলে সিটের ব্যবস্থা করে দিলেন।
৮ ফেব্রুয়ারি খবর পেলাম—দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জেলের ভেতরে আমরা মিছিল করলাম। এরপর থেকেই আমাদের ‘হাই সিকিউরিটি’ সেলে রাখা হলো। জামিনের আবেদন করলেও নিম্ন আদালত নট বেল করে দিল।
এদিকে বাসায় অসুস্থ মা, চার বছরের মেয়ে, আর স্ত্রী পাঁচ মাসের শিশুকে নিয়ে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কারাগারে থাকাকালীন অবস্থায় অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা করাতে পারিনি—অবশেষে তিনি ইন্তেকাল করলেন।
একটার পর একটা মামলা দিয়ে আমাকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হলো। এত নির্যাতন, কষ্ট, ত্যাগের পরও দলের মূল্যায়ন পাওয়া আমার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ল—স্থানীয় নেতাদের সিন্ডিকেটের কারণে।
তারপরও আশা করি—আগামী কমিটিতে ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে, দলকে সুসংগঠিত করে গড়ে তোলা হবে।
লেখক: যুবদল নেতা।